১৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ২রা ডিসেম্বর, ২০২০ ইং

বাবরি মসজিদ ভাঙার অগ্রসেনানী বলবীর সিং ও যোগেন্দ্র পাল এর মুসলমান হওয়ার গল্প

বলবীর সিং

বলবীর সিং ও যোগেন্দ্র পাল বাবরি মসজিদ ভাঙার অগ্রসেনানী ছিলেন। ২৫ বছর আগে তারা দু’জন বাবরি মসজিদের গম্বুজের চুঁড়ায় ওঠে দু’হাতে চালিয়েছেন শাবল। তারা উভয়েই এখন মুসলিম। রেখেছেন দাঁড়ি। বলবীর সিং মুহাম্মদ আমির নাম ধারণ করেছেন বলে জানা যায়।

দীর্ঘ ২৫ বছর আগে বলবীর সিংহ ও তার বন্ধু যোগেন্দ্র পাল সাধারণ পরিবার থেকে শিবসেনার সক্রিয় কর্মী হয়ে বাবরি মসজিদের চূড়ায় ওঠে শাবল দিয়ে মসজিদের গম্ভুজ ভেঙেছিলেন। মসজিদ ভাঙার পর তারা পানিপথে গেলে তাদেরকে দেয়া হয় সংবর্ধনা।

এই বদলে যাওয়াটা সম্ভব হল কীভাবে?

বলবীর বলছেন, সেটাই স্বাভাবিক ছিল। কারণ, তার পরিবার কোনও দিনই উগ্র হিন্দু ছিলেন না। ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান আর ইংরেজি, এই তিনটি বিষয়ে এমএ ডিগ্রি পাওয়া বলবীর তার মা, বাবা, ভাই, বোনদের নিয়ে ছোটবেলায় থাকতেন পানিপথের কাছে খুব ছোট্ট একটা গ্রামে। বলবীরের বয়স যখন ১০ বছর, তখন তিনি ও তার ভাইদের পড়াশোনার জন্য বলবীরের বাবা দৌলতরাম তাদের নিয়ে চলে যান পানিপথে।

বলবীর ‘মুম্বাই মিরর’কে বলেছেন, ‘আমার বাবা বরাবরই গান্ধীবাদে (মহাত্মা গান্ধী) বিশ্বাসী। তিনি দেশভাগ দেখেছিলেন। তার যন্ত্রণা বুঝেছিলেন। তাই আমাদের আশপাশে যে মুসলিমরা থাকতেন, উনি তাদের আগলে রাখতেন সব সময়। কিন্তু পানিপথের পরিবেশটা ছিল অন্য রকম। হরিয়ানার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসা লোকজনরা তেমন মর্যাদা পেতেন না পানিপথে।’

ফলে একটা গভীর দুঃখবোধ সব সময় তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াত বলবীরকে। সেই পানিপথেই একেবারে অচেনা, অজানা আরএসএসের একটি শাখার কর্মীরা বলবীরকে দেখা হলেই ‘আপ’ ‘আপ’ (আপনি, আপনি) বলে সম্বোধন করতেন।

বলবীর বলছেন, ‘সেটাই আমার খুব ভালো লেগেছিল। সেই থেকেই ওদের (আরএসএস) সঙ্গে আমার ওঠা বসা শুরু হয়। শিবসেনা করতে করতেই বিয়ে করি। এমএ করি রোহতকের মহর্ষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ওই সময় প্রতিবেশীরা ভাবতেন আমি কট্টর হিন্দু। কিন্তু বাবা কোনও দিনই মূর্তি পূজায় বিশ্বাস করতেন না। আমরা কোনও দিনই যেতাম না মন্দিরে। বাড়িতে একটা গীতা ছিল ঠিকই, কিন্তু আমি বা আমার ভাইয়েরা কেউই সেটা কখনও পড়িনি। পানিপথে কেউ বাঁ হাতে রুটি খেলেও তখন তাকে ‘মুসলিম’ বলে হেয় করা হয়।’

শিবসেনার লোকজনদের কাছ থেকে ‘সম্মান’ পেয়ে তাদের ভালো লেগে যায় বলবীরের। শিবসেনাই তাকে অযোধ্যায় পাঠিয়েছিল বাবরি ভাঙতে। পাঠিয়েছিল বলবীরের বন্ধু যোগেন্দ্র পালকেও। তারা হয়ে যান করসেবক।

বলবীর জানিয়েছেন, বাবরি ভেঙে পানিপথে ফিরে যাওয়ার পর সেখানে তাকে ও যোগেন্দ্রকে তুমুল সংবর্ধনা জানানো হয়। তারা যে দু’টি ইট এনেছিলেন বাবরির মাথায় শাবল চালিয়ে, সেগুলি পানিপথে শিবসেনার স্থানীয় অফিসে সাজিয়ে রাখা হয়।

কিন্তু বাড়িতে ঢুকতেই রে রে করে ওঠেন বলবীরের বাবা দৌলতরাম। বলবীরের কথায়, ‘বাবা আমাকে বললেন, হয় তুমি এই বাড়িতে থাকবে, না হলে আমি। তো আমিই বেরিয়ে গেলাম বাড়ি থেকে। আমার স্ত্রীও বেরিয়ে এল না। থেকে গেল বাড়িতেই।’

ওই সময় ভবঘুরের মতো জীবন কাটিয়েছেন বলবীর। জানিয়েছেন, লম্বা দাড়িওয়ালা লোক দেখলেই ভয়ে আঁতকে উঠতেন তখন। বেশ কিছু দিন পর বাড়িতে ফিরে জানতে পারেন, বাবা মারা গেছেন। তিনি বাবরি ভাঙায় যে দুঃখ পেয়েছিলেন বাবা, তাতেই নাকি তার মৃত্যু হয়েছে।

এরপর পুরনো বন্ধু যোগেন্দ্রের খোঁজ-খবর নিতে গিয়ে আরও মুষড়ে পড়েন বলবীর। জানতে পারেন, যোগেন্দ্র মুসলিম হয়ে গেছেন। যোগেন্দ্র নাকি তখন বলবীরকে বলেছিলেন, বাবরি ভাঙার পর থেকেই তার মাথা বিগড়ে গিয়েছিল। যোগেন্দ্রর মনে হয়েছিল পাপ করেছিলেন বলেই সেটা হয়েছে। প্রায়শ্চিত্ত করতে গিয়ে তাই মুসলিম হয়ে যান যোগেন্দ্র।

এর পরেই আর দেরি না করে সোনেপতে গিয়ে মাওলানা কালিম সিদ্দিকির কাছে মুসলিম ধর্মে দীক্ষা নেন বলবীর। হয়ে যান মোহাম্মদ আমির।

‘প্রায়শ্চিত্ত’ করতে কী কী করতে চান বলবীর সিংহ ওরফে মহম্মদ আমির? বলবীরের কথায়, ‘কম করে ভেঙে পড়া শ’খানেক মসজিদকে মেরামত করতে চাই।’

বলবীরের দাবি, ১৯৯৩ থেকে ২০১৭, এই ২৪ বছরে উত্তর ভারতের বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষ করে মেওয়াটে বেশ কিছু ভেঙে পড়া মসজিদ খুঁজে বের করে সেগুলির মেরামত করেছেন তিনি। উত্তরপ্রদেশের হাথরাসের কাছে মেন্ডুর মসজিদও নাকি মেরামত করেছেন বলবীরই। সেই কাজে মুসলিমরাই তাকে এগিয়ে এসে সাহায্য করেছেন, দাবি বলবীরের।

মুহাম্মদ আমির নাম ধারণ করেন। লম্বা দাড়ি রেখে দেন। নিয়মিত ভোরে ফজরের আজান দেন। সব সময় আল্লাহর জিকির-আজকার করেন।

লেখা: মিজানুর রহমান

সূত্র:

[1] Kar sevak from Haryana who was part of Babri Masjid demolition, now preaches Islam, builds masjids

[2] Hindu fanatic, part of Babri Mosque demolition now builds mosques

[3] The Forgiveness Special: Kar Sevak Balbir Singh who helped demolish Babri Masjid is now Mohammed Amir, a man determined to rebuild 100 mosques

[4] বাবরি মসজিদ ধ্বংসকারী সেই বলবীর সিং এখন মুসলিম! | কালের কণ্ঠ

 736 total views,  1 views today

Please Like & Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Be the first to comment on "বাবরি মসজিদ ভাঙার অগ্রসেনানী বলবীর সিং ও যোগেন্দ্র পাল এর মুসলমান হওয়ার গল্প"

Leave a comment

Your email address will not be published.


*